মাদরাসা পরিচিতি
ভূমিকাঃ
যে জাতি যত বেশী শিক্ষিত সে জাতি তত বেশী উন্নত। শিক্ষাই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিচালিত করে। আদর্শ সমাজ বিনির্মানে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। তবে এই শিক্ষা অবশ্যই হতে হবে কুরআন-সুন্নাহ্ ভিত্তিক আদর্শ ইসলামী শিক্ষা। এ দর্শনের আলোকে ১৮৬৬ সালে পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতির বিরুদ্ধে মুসলমানদের সতর্কীকরণ ও শিক্ষা সাংস্কৃতিকে কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক পরিচালনার নিমিত্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ”। স্বল্প সময়েই যার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়।
শতাব্দী ব্যাপী এই দারুল উলুম স্বীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অগনিত মহাপুরুষ সৃষ্টি করে যাচ্ছে অবিরত। যারা পৃথিবীব্যাপী সফলভাবে ইসলামের বহুমাত্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন। উপমহাদেশসহ আমাদের দেশেও কওমী মাদ্রাসাগুলো এই দারুল উলুম দেওবন্দেরই দুর্নিবার চেতনায় উজ্জীবিত ও শানিত খাঁটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের মাদ্রাসাটিও এর অন্যতম একটি।
নাম ও অবস্থানঃ
পূর্ণ নাম ঃ মাদরাসাতুল মাদানিয়া গাইবান্ধা।
প্রতিষ্ঠাতা ঃ মুফতি গোলাম মোস্তফা।
মুতাওয়াল্লী ও জমিদাতা : বীর মুক্তিযোদ্ধা নয়া মিয়া সরদার ও তাঁরই আপন তিন ভাই জনাব আবুল কালাম আজাদ সরদার, জনাব আব্দুস সালাম সরদার ও জনাব আসলাম সরদার। প্রথমে মরহুম বেলায়েত আলী সরদারের ছেলেদের পক্ষ থেকে ৪০ শতক জমি ওয়াকফ করে মাদরাসার নিজস্ব ভবন দাঁড় করানো হয়। অতপর এলকাবাসী তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
প্রতিষ্ঠাকাল ও সূচনা : মানুষকে মনুষত্ব শিখাবার জন্য ইসলামী শিক্ষা অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের গাইবান্ধাতে ইসলামী শিক্ষার এতটাই অভাব যে, শতকরা ৯৫টা মসজিদের ইমামের কুরআনে কারীমের তেলোয়াতই অশুদ্ধ ছিল। তাই ২০০৭ সালে ছাত্র যামানাতেই জালালাইন জামাতে শিক্ষাগ্রহণকালে অত্র এলাকার কৃতিসন্তান মুফতি গোলাম মোস্তফা তার আরো ৩ জন বন্ধু (মুফতি জহিরুদ্দীন, মাওলানা গিয়াস উদ্দিন ও মুফতি আমিরুল ইসলাম) কে সাথে নিয়ে রমজানে বয়স্ক শিক্ষার আয়োজন করেন। ২০০৭ সালের ২২ রমজান এলাকাবাসীর আগ্রহ ও প্রয়োজন অনুভব করে মুফতি গোলাম মোস্তফার ফুফুর পরিত্যাক্ত বাসায় অত্র মাদরাসা উদ্বোধন হয়।পরবর্তিতে ২০০৯ সালে প্রথমে মরহুম বেলায়েত আলী সরদারের ছেলেদের পক্ষ থেকে ৪০ শতক জমি ওয়াকফ করে মাদরাসার নিজস্ব ভবন দাঁড় করানো হয়। অতপর এলকাবাসী তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যঃ
সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ). আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, আকাবিরেদ্বীন ও সালাফে সালেহীনের গবেষণালব্ধ জ্ঞানের আলোকে কুরআন ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ তালীম দান। ইলমে দ্বীন হাসিলের সাথে সাথে নেক আমল ও আখলাকে নববীর আলোকে শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ে তোলার মাধ্যমে এমন একদল উলামা গঠন করা, যাঁরা সাহাবায়ে কিরাম ও আকাবিরে উম্মতের কৃতজ্ঞ উত্তরসূরী হিসাবে ওরাসাতে নববীর দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে।
যুগ সচেতনতার সাথে সাথে কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা প্রদান এবং শিক্ষার্থীর লিখনী ও বাক শক্তির স্ফুরন ঘটানোর জন্যে প্রশিক্ষণ দান করা, যেন শিক্ষার্থীগন যুগ-জিজ্ঞাসার উত্তর প্রদান ও স্ব-স্ব যুগের সমূহ বাতিল ইজম ও মতবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষা আকর্ষনীয় ভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে একজন খাঁটি মুবাল্লিগের দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়। উপরোক্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মাদরাসার তা’লীম ও তরবিয়াতের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।
মাদরাসার সিলেবাসঃ
১। কুরআন মজীদ, হাদীসে নববী, তরজমা, ফেকাহ (আইনশাস্ত্র), কালাম (দর্শন শাস্ত্র), আখলাক (চরিত্র দর্শন), সীরাত ও তারীখ, উসুলে ফেকাহ ও তাজভীদ ইত্যাদি।
২। আদব (সাহিত্য-আরবী ও বাংলা),বালাগাত ( অলংকার শাস্ত্র), নাহু ( ব্যাকরণ-আরবী ও বাংলা), সরফ (শব্দ প্রকরণ শাস্ত্র), রচনা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ভাষার সাহিত্য।
৩। বিভিন্ন ধর্মতত্ব ও মতবাদের তুলনামূলক আলোচনা।
৪। প্রয়োজনীয় অংক শাস্ত্র ও ইংরেজী ভাষা শিক্ষাদান।
জামিয়ার বর্তমান বিভাগ সমূহঃ
১। মক্তব বিভাগঃ এ বিভাগে শিক্ষার্থীদের বিশেষ ট্রেনিং প্রাপ্ত ক্বারী সাহেবদের মাধ্যমে তাজভীদ সহকারে সহী শুদ্ধভাবে কুরআন মজীদ শিক্ষাদানের সাথে সাথে জীবনের জন্য আবশ্যকীয় পরিমাণ মাসলা-মাসায়েল, আদব-কায়দা, নিয়ম-নীতি ও আমল-আখলাক শিক্ষা দেয়া হয়। যাতে এ বিভাগ হতে উত্তীর্ণ কোন শিক্ষার্থীর এ শিক্ষা তার ধর্মীয় জীবনের মূল ভিত্তি হয়ে থাকতে পারে। ৩ বছরের পূর্ণ কোর্সের এ বিভাগে প্রাইমারী পর্যায়ে বাংলা, ইংরেজী, অংক ও দ্বীনীয়াত শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
২। হিফজ বিভাগঃ এ বিভাগে দক্ষ হাফিজে কুরআন দ্বারা হিফজ ইচ্ছুক ছাত্রদেরকে নুন্যতম সময়ের মধ্যে কুরআনের হাফিজ বানানো হয়। এবং কিরাআতে বিশেষভাবে পারদর্শী করে তোলা হয়।
৩। কিতাব বিভাগঃ মাদরাসার প্রধান ও বৃহত্তম বিভাগ এটি। এতে বর্তমানে ২টি স্তর রয়েছে।
ক) ইবতিদায়ী (প্রাইমারী)
খ) ছানূবী (মাধ্যমিক)
৪। ছাত্র প্রশিক্ষণ বিভাগঃ পাঠ্য সূচীর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে ছাত্র প্রশিক্ষণের নিমিত্তে উন্মুক্ত কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়।
ক) ছাত্র পাঠাগারঃ পাঠ্য বইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্নমুখী জ্ঞান-বিজ্ঞানের পুস্তক ও পত্র পত্রিকা সমৃদ্ধ মাদানি পাঠাগার নামক একটি পাঠাগারের ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষানুরাগী ও ছাত্র বন্ধু মহানুভব ব্যক্তিদের আর্থিক অনুকূল্য লাভে সমর্থ হলে পাঠাগারটি আরো সমৃদ্ধ হবে।
খ) মাসিক দেয়াল পত্রিকা : বর্তমানে লেখনীর যুগে বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষা প্রচারের যোগ্যতা সৃষ্টির জন্যে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের আয়োজনে বাংলা ও আরবী ভাষায় দু’টি দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে।
গ) বক্তৃতা প্রশিক্ষণ মজলিস : ইলমেদ্বীন হাসিলের পর বিশাল কর্মক্ষেত্রে দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের দায়ীত্ব পালনের আবশ্যকতাকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের বাকশক্তির স্ফুরন ঘটানো এবং আকর্ষণীয় ভাবে দাওয়াত পেশের প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে উপযুক্ত শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে সাপ্তাহিক বক্তৃতা মজলিসের সুষ্ঠু ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
লক্ষ-উদ্দেশ্যঃ
যে জাতি তার গৌরবময় অতীতকে ভুলে যায়, ভুলে যায় পূর্বসূরীদের বীরগাঁথা ইতিহাস ও অবদানকে, সে জাতি কোন দিন বিশ্ব সংসারে মাথা উঁচুকরে দাঁড়াতে পারেনা। পারেনা তারা বিজাতির অনধিকার চর্চার বিরুদ্ধে হিম্মতের সাথে বুকটান করে কথা বলতে। ফলে তারা অথর্ব ও ব্যার্থ জাতিতে পরিণত হয়। কালের পরিক্রমায় এমনি এক অনাকাঙ্খিত অবস্থায় উপনীত হয়েছে বর্তমান মুসলিম প্রজন্ম। ধর্মীয় স্বকীয়তা ও জাতীয় চেতনা থেকে অনেক অনেক দূরে আজ আমাদের অবস্থান। স্বজাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সফলতার স্মৃতিকে আজ আমরা ভুলে গেছি। আকাবীরে উম্মতের চিন্তা-চেতনা, দর্শন ও আদর্শকে পরিত্যাগ করে গ্রহণ করেছি খোদাদ্রোহী অর্বাচীন লোকদের যতসব মতবাদ।
সিংহভাগ মুসলিম জনসাধারণ আজ ধর্মহীন নাস্তিক্যবাদী শিক্ষা ও বিজাতিয় অপসাংস্কৃতির অনুসরনের মাধ্যমে শান্তি ও প্রগতির আশায় স্বপ্নে বিভোর। দেশ ও জাতির এই বাস্তবাবস্থাকে প্রত্যক্ষ করে সমাজ পরিবর্তনের মহান লক্ষ্যে আমাদের পথ চলা। এ পথে সফলতা পেতে হলে মহান আকাবীরে উম্মতের জীবনাদর্শকে মাইলফলক হিসাবে গ্রহণ করা আবশ্যক। সেই কর্তব্য বোধকে আমলে পরিণত করার উদ্দেশ্যে আমাদের এ ক্ষুদ্র আয়োজন। এর ফলে যদি মহান পূর্বসূরীদের স্ববিস্তার যিন্দেগী জানার প্রতি পাঠকগণের হৃদয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হয়, তাহলে নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান মনে করব। মহান আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের আকাবীরে আসলাফের পদাঙ্কানুস্বরণের তাওফীক দিন। আমীন।